• ফুটবল, অন্যান্য
  • " />

     

    বিদায়, ম্যারাডোনা!

    বিদায়, ম্যারাডোনা!    

    কিংবদন্তী ডিয়েগো ম্যারাডোনা চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন। বৃহস্পতিবার বুয়েনস আইরেসের বেল্লা ভিস্তায় তাকে সমাহিত করা হয়। ২০-২৫ জন পরিবারের সদস্য ও একান্ত কাছের বন্ধুরা উপস্থিত ছিলেন ম্যারাডোনার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে।

    এর আগে বৃহস্পতিবার সারাদিন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেনসিয়াল প্যালেস কাসা রোসাদায় ভক্তরা শেষবারের মতো সম্মান জানিয়ে গেছেন ম্যারাডোনার কফিনে। পুরো ফুটবলবিশ্বই ম্যারাডোনার প্রয়াণে শোকাহত, সেই শোক স্বাভাবিকভাবেই আরও কয়েকগুণ বেশি ছিল তার নিজ দেশ আর্জেন্টিনায়। লাখে লাখে মানুষ আর্জেন্টিনার রাজধানীতে সমবেত হয়েছিলেন ম্যারাডোনাকে বিদায় জানাতে। করোনা পরিস্থিতির ভেতর তাদের সবাইকে সামাল দিতে হিমশিমও খেতে হয়েছে স্থানীয় পুলিশকে। পুলিশের বিপক্ষে কয়েক জায়গায় কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের অভিযোগও উঠেছে।

    আর্জেন্টিনার মতো শোকে মুষড়ে পড়েছে নেপলসও। ইতালির এই শহরের ক্লাব নাপোলিতে টানা ৭ বছর খেলেছেন ম্যারাডোনা। ইউরোপা লিগে রিয়েকার বিপক্ষে ম্যাচে নাপোলির খেলোয়াড়রা সবাই মাঠে নেমেছিলেন ম্যারাডোনার দশ নম্বর জার্সি গায়ে চাপিয়ে। ম্যারাডোনা ১৯৯১ সালে নাপোলি ছাড়ার পর থেকে তার সম্মানে দশ নম্বর জার্সিটি তুলে রেখেছে নাপোলি। এতোদিন পর সেই জার্সি ফিরল ম্যারাডোনার প্রয়াণে।

     


    আরও পড়ুন


    'মানুষ' ম্যারাডোনা, 'ঈশ্বর' ম্যারাডোনা
    (অম্লান মোসতাকিম হোসেন)


    ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে আপনি ঘৃণা করতে পারেন। যে লোকটা বিশ্বকাপ ফুটবলের কোয়ার্টারে হাত দিয়ে গোল দেয়, সেই অবৈধ গোলের কথা আবার বড়াই করে বলে, তাকে মন থেকে অপছন্দ আপনি করতেই পারেন।

    ম্যারাডোনা লোকটাকে আপনি অশ্রদ্ধা বা অভক্তিও করতে পারেন। যে লোকটা কোকেনের মতো ড্রাগ সেবন করে নিষিদ্ধ হয়, গুচ্ছের ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, আর অশ্লীল অশালীন সব অঙ্গভঙ্গি করে বসে, এমনকি যাকে দেখে সবসময়েই মনে হয় নেশার ঘোরে আছে, তার প্রতি শ্রদ্ধা না আসাটাই স্বাভাবিক।

    ম্যারাডোনা লোকটা আপনি করুণাও করতে পারেন। যে লোকটা এভাবে বিশ্বকাপ জেতালো, তার মতিগতি যেন কিশোরী মেয়ের মতো। তার মধ্যে কোনো স্থিরতা নেই, যেন সবে স্কুলে পা দেওয়া ছেলেটির মতো কোথাও দুদন্ড বসার ফুরসত নেই। এত বড় একটা খেলোয়াড়ের মানসিক বুদ্ধি এতোটা নিচে, সেটা ভেবে আপনার একটু খারাপ লাগতে পারে, হয়তো হাসিও আসতে পারে। যে লোকটা কথায় কথায় হেসে ওঠে, আবার কথায় কথা কেঁদেও ওঠে, তাকে নিয়ে চাইলে হাসাহাসিও করা যায়। মাথার তো আর ঠিক নেই তাঁর....


    ডিয়েগো, আপনি এবার বিশ্রাম নিন...
    (রিফাত মাসুদ)

     


     


    ....ফুটবল ছাড়ার পরও সুখ জোটেনি ম্যারাডোনার কপালে। নানান কারণে নিয়মিত শিরোনাম হয়েছেন। মাদকাসক্তি থেকে আসলে কখনই আর বের হওয়া হয়নি তার। ব্যস্ততাকে ফাঁকি দিয়ে কয়েক মুহুর্ত হারিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, এরপর অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে সেটা। ম্যারাডোনা যে মাত্র ৬০ বছর বয়সেই চলে গেলেন, তার পেছন তার অনিয়ন্ত্রিত জীবনের দায়টাই তো বড়।

    এর মাঝেও ডিয়েগো হয়ে বেঁচে ছিলেন ম্যারাডোনা। বস্তির কথা কখনও ভোলেননি তিনি। ভোলেননি শেকড়ের কথা। ভ্যাটিকান সিটির সোনায় বাধানো ছাদ দেখে তাই অনাহারী শিশুর কথা মনে পড়ে তার। খাবার, পানি, বিদ্যুৎবিহীন জীর্ণ ঘরটার কথা মনে পড়ে। যেখান থেকে উঠে এসে বিশ্বকে ছুঁয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তার বিদায় আরও একবার বিশ্বকে ছুঁয়ে গেল। তবে ম্যারাডোনা বোধ হয় কাঙ্খিত সেই ছুটি পেলেন। যে বিশ্রামটুকুর জন্য বুয়েনস আইরেস, বার্সেলোনা, নাপোলিতে হন্যে হয়ে ঘুরেছিলেন ডিয়েগো নামের ম্যারাডোনা- সেটা মিলল মরণে।

    ডিয়েগো, আপনি বিনোদন দিয়েছেন, বিনোদন পেয়েছেন। সঙ্কটে সঙ্কটে কাটিয়ে দিয়েছেন এক জীবন, অনেক হয়েছে, এবার একটু বিশ্রাম করুন। সে জন্যই তো এতো কিছু?


    যার বাঁ পায়ের কাছে লুটাতো পৃথিবী
    (প্রিয়ম মজুমদার)


    নব্বইয়ের জুলাই। নাপোলির সান পাওলো স্টেডিয়াম। টাইব্রেকারে দলের চতুর্থ শট নিতে আসছেন ঘরের ছেলে। তবে ভুল জার্সিতে, আর্জেন্টিনার হয়ে। আগের ম্যাচেই টাইব্রেকারে শট মিস করেছেন। কী ভীষণ স্নায়ুচাপ! আর চারদিকে গ্যালারিভরা দ্বিধাগ্রস্থ দর্শক যারা কীনা ম্যাচের একশ’ বিশ মিনিট পরেও বুঝে উঠতে পারছে না কার জন্য চেঁচাবে। নিজের দেশ নাকি এই পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি গড়নের ভিনদেশী লোকটার জন্য? যে এতকাল দু’হাত ভরে দিয়ে গেল তাদের, আজ বুঝি সব ফিরিয়ে নিবে? বিধাতা এমন রাতের জন্য নিজ হাতে লিখে রাখেন এসব স্ক্রিপ্ট! 

    তবে সেসময় নাপোলির লোকজনের কাছে বিধাতা মানে এই লোকটাও। যিশু খ্রিস্টের ছবির পাশে আঠা দিয়ে লাগানো থাকত তারও ছবি। ইতালির অভিজাত এলাকার কাছে চিরকালের অচ্ছ্যুৎ নাপোলিকে একাই বানিয়েছেন ইতালির সম্রাট, পরিয়েছেন ইউরোপ সেরার মুকুট। শহরের কবরস্থানের পাশে তাই ব্যানার ঝুলত মৃতদের উদ্দেশ্যে, ‘তোমরা জানোও না কী মিস করেছ!’  

    নাপোলির আগে অবশ্য জয় করা হয়ে গিয়েছিল দুনিয়াও- ছিয়াশিতে, প্রাসাদের নগরী মেক্সিকান সিটিতে। সাদামাটা এক দলকে নিয়ে একাই শিরোপা জেতানোর গল্প কেবল পাওয়া যায় রূপকথায়, গল্পে, সিনেমাতে। সেটাকে মর্ত্যে নামিয়ে আনলেন তিনি। পুরো ফাইনালেই আটকে ছিলেন ম্যাথিউসের কঠিন শৃংখলে; দুই গোলের লিড হারানোর পর হঠাৎই গা-ঝাড়া দিয়ে উঠলেন যেন। মার্কারদের ছিটকে ‘কিলার পাস’ বাড়িয়ে দিলেন বুরুচাগাকে। হাতে নিলেন দুনিয়ার তাবৎ ফুটবলারদের সবচেয়ে আরাধ্য ট্রফিটা।  


    নীরবতা পালন করে মিরপুরে ম্যারাডোনাকে শ্রদ্ধা

    ভিডিও: নাপোলিতে ম্যারাডোনার সেরা সব গোল

    চলে গেলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা

    একদিন স্বর্গে আমরা একসঙ্গে খেলব: পেলে